41>|| পুরীর মন্দিরের এক গুপ্ত রহস্য ||
পুরীর মন্দিরে আছেন এক তান্ত্রিক গণেশ
যা অনেকেরই হয়তো অজানা।
পুরীর শ্রীজগন্নাথ মন্দিরের পশ্চিম দ্বারের সন্নিকটে ভিতরের দিগে স্থাপিত রয়েছে এক অত্যন্ত গুহ্য ও বিরল তান্ত্রিক
গণেশ বিগ্রহ, যা লোকমুখে ভাণ্ড গণেশ কেউ কেউ কাঞ্চী গণেশ নামে পরিচিত।
আমরা সর্বদা দেখি অতি সাধারণ শান্ত ও মঙ্গলময় গণেশ মূর্তি।
কিন্তু এই গণেশ মূর্তিরও আছে ভয়ঙ্কর তান্ত্রিক রূপ।
পুরীর মন্দিরে পশ্চিম দ্বারের নিকটে শান্ত গণেশ মূর্তির পরিবর্তে এই প্রতিমাটি খোদাই করা হয়েছে প্রাচীন ‘উচ্ছিষ্ট গাণপত্য’ সম্প্রদায়ের চরম বামমার্গীয় তন্ত্রশাস্ত্রের বিধানে। বিগ্রহের বাম ঊরুর ওপর তাঁর অন্তর্নিহিত মহাশক্তি নগ্নিকা রূপে উপবিষ্টা এবং গণপতির শুঁড়টি অতীব নিগূঢ় তান্ত্রিক সংকেত বহন করে দেবীর যোনিদেশ স্পর্শ করে রয়েছে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এটি প্রথাবিরোধী মনে হলেও উচ্চমার্গের শাক্ত ও গাণপত্য সাধকদের কাছে এই বিগ্রহ সৃষ্টির আদি কামশক্তি ও পরম চৈতন্যের অদ্বৈত মিলনাত্মক এক জীবন্ত আধ্যাত্মিক রূপ।
এই গুহ্য বিগ্রহের পুরীতে আগমনের পেছনে জড়িয়ে আছে পঞ্চদশ শতকের এক রোমহর্ষক অধ্যায়, যা ওড়িশার প্রাচীন ইতিহাস ও ‘মাদল পাঁজি’-তে ★কাঞ্চী অভিযান★ নামে লিপিবদ্ধ। পুরীর গজপতি রাজা পুরুষোত্তম দেব দক্ষিণ ভারতের কাঞ্চী রাজ্যের রাজকুমারী পদ্মাবতীর পাণিপ্রার্থনা করেছিলেন। কিন্তু রথযাত্রার পুণ্যলগ্নে রাজাকে শ্রীক্ষেত্রের রীতি অনুযায়ী জগন্নাথের রথের সামনে স্বহস্তে সোনার ঝাঁটা দিয়ে পথ পরিষ্কার বা ‘ছেড়া পহরা’ করতে দেখে কাঞ্চীরাজ তীব্র কটাক্ষ করেন। তিনি ওড়িশার রাজাকে ‘চণ্ডাল’ বা মেথর আখ্যা দিয়ে বিবাহ প্রস্তাব নাকচ করে দেন। ভক্ত রাজার এই চরম অপমানের প্রতিশোধ নিতে পুরুষোত্তম দেব কাঞ্চী আক্রমণ করেন, কিন্তু প্রথম অভিযানে এক অদৃশ্য অলৌকিক বাধার সম্মুখীন হয়ে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন।
কাঞ্চীরাজের এই অপরাজেয় শক্তির উৎস ছিল তাঁদের কুলদেবতা রূপে প্রতিষ্ঠিত এই তান্ত্রিক সিদ্ধ গণপতির অলৌকিক সুরক্ষা। লোকগাথা অনুযায়ী, এই গণেশ স্বয়ং জাগ্রত হয়ে তাঁর প্রচণ্ড মায়াশক্তি দিয়ে কাঞ্চী দুর্গকে রক্ষা করতেন এবং শত্রুপক্ষের যাবতীয় রণকৌশল ব্যর্থ করে দিতেন। প্রথম যুদ্ধের চরম পরাজয়ে ভগ্নহৃদয় রাজা পুরুষোত্তম জগন্নাথের চরণে লুটিয়ে পড়ে আশ্রয় চান। ভক্তের আর্তিতে সাড়া দিয়ে স্বয়ং শ্রীজগন্নাথ শ্বেত অশ্বে এবং বলভদ্র শ্যামল অশ্বে কাঞ্চীর রণক্ষেত্রের দিকে গোপনে যাত্রা করেন—যাঁদের যাত্রাপথেই চিল্কা হ্রদের তীরে গোয়ালিনী মাণিকার কাছ থেকে দই খেয়ে রত্নখচিত অলৌকিক আংটি দেওয়ার কাহিনি আজও ওড়িশার ঘরে ঘরে প্রচলিত।
রণক্ষেত্রে স্বয়ং জগন্নাথের তেজ অবতীর্ণ হতেই কাঞ্চীর সেই তান্ত্রিক মায়ার প্রাচীর চূর্ণ হতে শুরু করে। গণদেবতা উপলব্ধি করেন যে তাঁর পরম আরাধ্য বিশ্বপতি স্বয়ং রণক্ষেত্রে উপস্থিত, ফলে কাঞ্চীরাজের অহংকারের পক্ষ নেওয়া আর সম্ভব নয়। তান্ত্রিক গণেশ তাঁর দৈব সুরক্ষা প্রত্যাহার করে নিলে কাঞ্চীরাজ যুদ্ধে সম্পূর্ণ পরাস্ত হন। বিজয়ী রাজা পুরুষোত্তম দেব শুধু রাজকুমারী পদ্মাবতীকেই পুরীতে নিয়ে আসেননি, যুদ্ধজয়ের শ্রেষ্ঠ স্মারক হিসেবে কাঞ্চীর সেই মহাশক্তিধর তান্ত্রিক গণেশকেও শ্রীমন্দিরে নিয়ে এসে প্রতিষ্ঠা করেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শ্রীমন্দিরের প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভাণ্ড গণেশ ওড়িশার রাজকীয় ইতিহাস, ভক্তি ও তন্ত্রের চরম সত্যের এক চিরন্তন প্রতীক।
( সংগৃহিত )
======================
No comments:
Post a Comment