38>|| জগন্নাথপুরীর-দুর্গাপূজা ||
<----আদ্যনাথ রায় চৌধুরী---->
দেখলাম পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে এক রহস্যেভরা অনন্য দুর্গাপূজা। এমন দুর্গাপূজা ভূভারতে আর কোথাও হয় না। ১৬ দিন ধরে চলা এই দুর্গাপূজা উৎসব যা জগন্নাথ দেবের সাথে দেবী বিমলার পূজা অনুষ্ঠিত হয়।এটি জগন্নাথ মন্দিরে দুর্গা পূজা যা "গোসানী যাত্রা" বা "সোহলা পূজা" নামে পরিচিত। পুরীর জগন্নাথ দেব দর্শনের কিছু রীতি আছে সেই রীতির প্রধান অঙ্গ শ্রীমন্দিরে ভগবান শ্রীজগন্নাথ দেবের দর্শনের পূর্বে দেবী বিমলার কাছে গিয়ে পীঠদর্শনের অনুমতি চাইতে হয়।
আমি কিন্তু এবার শ্রীমন্দিরে দর্শনার্থীর অত্যাধিক ভিড়ের কারনে, সাক্ষাৎ 'মা' এর দর্শন ও অনুমতি নিতে সক্ষম নাহলেও মনে মনে 'মা' এর আদেশ প্রার্থনা করেছিলাম।
মনেহয় "মা" বিমলা আমার অনুরোধ স্বীকার করে আমাকে শ্রী মূর্তি দর্শনের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। আমি 16 দিন ধরে সম্পুর্ন উৎসব দুর্গা-মাধব উৎসব দর্শন করতে সক্ষম হয়েছিলাম। জগন্নাথ পুরী বিভিন্ন নামে বিখ্যাত :--নীলাদ্রি, নীলাচল, শঙ্খক্ষেত্র, নাভিক্ষেত্র,পুরুষোত্তম ক্ষেত্র, জগন্নাথ পুরী। "পুরীর শ্রীমন্দির শুধু চতুর্ধামের এক ধাম কিংবা বৈষ্ণব তীর্থভূমিই নয়, এর আরও একটি বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। এখানে শ্রীমন্দিরের কূর্মবেড়ের মধ্যেই সতীর অঙ্গ পতিত হয়েছিল। ফলে এটি একটি সিদ্ধ সতীপীঠও বটে। এখানে পীঠদেবী হলেন বিমলা, আর ভৈরব হলেন সাক্ষাৎ জগন্নাথ দেব।"গবেষকগণ মনে করেন এই ক্ষেত্রে দেবীর নাভিদেশ পড়েছিল। এবং এর সঙ্গে কৃষ্ণের নাভিপদ্ম দারুব্রহ্ম, জগন্নাথে পরিণত হওয়ার ঘটনার সঙ্গেও বিশেষ মিল আছে। এই কারণেই শ্রীক্ষেত্রের অপর নাম নাভিক্ষেত্র। আবার অনেকেই মনেকরেন, এখানে সতীর পাদপদ্ম পতিত হয়েছিল। সেই কারণেই এই ক্ষেত্রকে পাদপীঠ বলেও অভিহিত করা হয়। পুরীর জগন্নাথ দেবের শ্রীক্ষেত্রে,(16) ষোলো দিনের শারদীয়া মহাপূজা আশ্বিন শুক্লা সপ্তমী থেকে আশ্বিন শুক্লা দশমী পর্যন্ত বিশেষ আড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয় দুর্গাপূজা যে পূজা "দুর্গা-মাধব উপাসনা "নামে প্রসিদ্ধ।
★নারীদের প্রবেশ নিষেধ==>এই পূজার কিছু বিশেষ নিয়মের মধ্যে একটি হলো এখানে দুর্গাপুজোর সময় শ্রী মন্দিরে নারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ । কারণ--এই সময়কালে অনুষ্ঠিত কিছু আচার-অনুষ্ঠানগুলি গোপনে কিছু নির্বাচিত সেবায়েত দ্বারা সম্পন্ন করা হয়। মনেকরা হয় এই সময়ে "মা" বিমলা তাঁর ভীষণ আক্রমণাত্মক রূপ ধারণ করেন। বিশেষ করে আশ্বিন মাসের সপ্তমী, অষ্টমী এবং নবমী দুর্গা পূজার এই তিন দিন দেবী বিমলার তান্ত্রিক রূপের প্রকাশ স্পষ্ট হয়। বিশ্বাস করা হয় যে এই সময়কালে করুণাময় বিমলা তাঁর ধ্বংসাত্মক মুখ প্রদর্শন করেন। দুর্গা পূজার ষোল দিনের পুরো সময়কালে, দেবী বিমলা শক্তির বিভিন্ন বেশ ধারণ করেন, যা নির্দিষ্ট অবতার এবং তার স্বরূপ প্রদর্শন করে। দুর্গাপূজার সময় দেবীকে তার সবচেয়ে আক্রমণাত্মক এবং শক্তিশালী রূপের দর্শন দেন, তাঁর সেই ভীষণ রূপ সহ্য করা সহজ ব্যাপার নয় বিশেষ করে নারীদের পক্ষে , সেই কারণেই বোধ হয় দুর্গাপূজার সময়, মহিলাদের মন্দিরে প্রবেশ নিষিদ্ধ।
★অদ্বৈত ব্রহ্ম====>
জগন্নাথ দেব স্বরূপত " মহাযানিক শূন্য" এবং "অদ্বৈত ব্রহ্ম"।
পুরীর শ্রী জগন্নাথ ধামের মূল পীঠে শ্রী জগন্নাথ দেব কে শিব রূপে এবং দেবী বিমলাকে শক্তিরূপে উপস্থিত করা হয়।
শ্রী মন্দিরের দুর্গা পূজা এটি একটি অনন্য উৎসব যেখানে জগন্নাথের বৈষ্ণব ও শাক্ত ঐতিহ্যের মিলন ঘটে, এবং বিশেষ কিছু আচার নিয়মে কিছু গোপনীয়তার মধ্যে এই পূজা সম্পন্ন হয়।
শ্রী ক্ষেত্রের এই দুর্গা পূজা অন্যান্য স্থানের মতো দুর্গা পূজা নয়। এই পূজা এক প্রাচীন ও রহস্যময় ঐতিহ্য বহন করে।
★পুরীর দুর্গা পূজার বিশেষত্ব===>
★১৬ দিনের উৎসব==> পুরীর দুর্গা পূজা টানা ষোলো দিন ধরে চলে।
আশ্বিন কৃষ্ণাষ্টমী থেকে আশ্বিন শুক্লা নবমী পর্যন্ত রথ যাত্রাকে "শাক্ত গুন্ডিচা" বা "সারদীয় রথযাত্রা" নামেও পরিচিত। দশমীতেও নানান অনুষ্ঠান হয়।
★দেবী বিমলার পূজা==>এই উৎসবে জগন্নাথের সাথে দেবী বিমলার পূজা করা হয়, যিনি জগন্নাথ ধামের শক্তি রূপে বিরাজিতা ।
★জগন্নাথ-মাধব উপাসনা==>এই পূজাকে 'দুর্গা-মাধব উপাসনা'ও বলা হয়, যেখানে জগন্নাথকে মাধব রূপে এবং বিমলা দেবীকে দুর্গা রূপে পূজা করা হয়।
★প্রসাদ==>এই পূজার প্রসাদ সকলের জন্য নিষিদ্ধ, এই মহা প্রসাদ শুধুমাত্র নির্বাচিত কিছু ব্যক্তিই পেয়ে থাকেন।
★ভৈরব, ভৈরবী====>
পুরীর শ্রী জগন্নাথ দেব হলেন ভৈরব এবং দেবী বিমলা হলেন ভৈরবী , যিনি বিবর্তন ও ধ্বংসের পথ নিশ্চিত করেন। তিনিই শ্রীমন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। দেবতা শ্রী জগন্নাথ - বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অধিপতি, তাঁর সাথে আছেন অভিভাবক দেবী, চতুর্ভুজা দেবী, আদ্যা শক্তি - মা বিমলা।
★দেবী বিমলাকে কাত্যায়নী, দুর্গা, ভৈরবী, ভুবনেশ্বরী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেবী বিমলা এই বিশ্বপ্রকৃতির প্রতিনিধিত্ব করেন এবং শ্রী জগন্নাথ দেব পুরুষের প্রতিনিধিত্ব করেন ।
★শ্রী ক্ষেত্র তীর্থ::===>
"তীর্থ মানুষকে উত্তীর্ণ করে।"
মানুষের কামনা ই-হ জীবনের সকল দুঃখ,কষ্ট , শোক তাপ থেকে মুক্তিপাবার জন্য কিংবা মৃত্যু থেকে অমৃতে উত্তীর্ণ হবার চেষ্টা। সকলেই ব্যাকুল একটু শান্তির খোঁজে। তাইতো মানুষ ভ্রমন করে, তীর্থযাত্রা বা তীর্থদর্শন করে। কতমানুষ তীর্থে তীর্থে ঘুরেবেড়ায় শুধু পুণ্য অর্জনের কামনায়। কেউ আবার চাওয়া পাওয়ার ইচ্ছা পূরণের কামনায় তীর্থ ভ্রমন করে। একথা ঠিক যে তীর্থ দর্শন মানুষকে আধ্যাত্মিকভাবে উন্নত করে। পার্থিব দুঃখ ও সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দেয় এবং মানসিক ও আত্মিক শান্তি প্রদান করে।
"ভারতবর্ষের শত-সহস্র তীর্থের মধ্যে এক সুবিখ্যাত মহাতীর্থ হল উৎকলদেশে বঙ্গোপসাগর বা ভক্তমান্য মহোদধির তীরে শ্রীক্ষেত্র।"
আসমুদ্রহিমাচল এই শ্রীক্ষেত্র কে,শুধুমাত্র 'পুরী' "জগন্নাথ পুরী" নামেই চেনে। "বিভিন্ন পুরাণে, ধর্ম গ্রন্থে, তন্ত্রে, এই তীর্থের মাহাত্ম্য বর্ননা করা হয়েছে। প্রচার হয়েছে তীর্থদেবতা পুরুষোত্তম দারুব্রহ্ম জগন্নাথের অপার মহিমা।"
যদিও নানান রহস্যে ঘেরা এই জগন্নাথ ধাম। রহস্য শ্রী জগন্নাথ দেবের প্রকৃত স্বরূপ নিয়ে, তাঁর মন্দির বা বড়দেউল নিয়ে। তাঁর পূজাপদ্ধতি বা ভোগ নিয়েও রহস্যের অন্ত নেই। এমনকি তাঁর রান্নাঘর নিয়েও রহস্যের শেষ নাই। এখানে প্রতিটি স্থানে প্রতি পদে বুঝি রহস্যে ঘেরা।
এই শ্রীমন্দিরের নিত্যদিনের বহু গুপ্ত কৃত কর্ম অনুষ্ঠান বাইরের ভক্ত-দর্শনার্থীদের কাছে বিস্তারিত প্রকাশ করা হয় না। আবার অনেক কিছু প্রকাশ্যে এলেও তার প্রকৃত তত্ত্ব অনুধাবন করা সকলের পক্ষে সম্ভব নয়। এখানে কিছু ক্রিয়া কর্ম, কিছু রহস্যের জন্ম দেয়। যেমন, গুণ্ডিচাযাত্রা, আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে যে-রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়, সাধারণত তাকেই গুণ্ডিচাযাত্রা বলেই সবাই জানি। কিন্তু এখানেও আছে অনেক রহস্য,যেমন সারাবছর ধরে শ্রীমন্দিরে একাধিক গুণ্ডিচাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। ★আষাঢ়মাসের বিখ্যাত রথযাত্রা ●শ্রীগুণ্ডিচাযাত্রা ●শাক্ত গুণ্ডিচাযাত্রা, ●বসন্ত গুণ্ডিচাযাত্রা, ●সৌর গুণ্ডিচাযাত্রা এবং● শৈব গুণ্ডিচাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এর মধ্যে★ শারদীয়া মহাপূজার সময় শাক্ত গুণ্ডিচাযাত্রাটি অপরাপর সকল গুণ্ডিচাযাত্রার থেকে পৃথক এক রথ যাত্রা। এই সময় দুর্গা এবং মাধব একত্রে বিরাজ ও বিহার করেন। অন্যান্য গুণ্ডিচাযাত্রার তুলনায় এই যাত্রার কালপর্বটিও অনেকটা দীর্ঘ(16) ষোলো দিন চলে দুর্গামাধবের এই বিশেষ শাক্ত গুণ্ডিচাযাত্রা । এই শাক্ত গুণ্ডিচাযাত্রা ছাড়া আরও কিছু গুণ্ডিচাযাত্রা আছে যেমন ●দেবী গুণ্ডিচা, ●আশ্বিন গুণ্ডিচা, ●বিজয়া গুণ্ডিচা, ●গুপ্ত গুণ্ডিচা প্রভৃতি নামেও পরিচিত।
★পীঠস্থান====>
পীঠস্থান মাত্রেই পীঠকে কেন্দ্র করে নানান মতভেদ থাকে। অনেক মতভেদ থাকলেও জগন্নাথ দেবের শ্রীমন্দিরে শক্তিস্বরূপিণী বিমলার গুরুত্ব অসীম। প্রকৃত পক্ষে বিমলাকে শ্রীক্ষেত্রের অধিশ্বরীরূপে গণ্য করা হয়। এখানে দেবীকে "শ্রীপাদপীঠেশ্বরী" "নিলাদ্রিগৃহে-শ্বরী" বা "শ্রীক্ষেত্ররাজেশ্বরী" বলা হয়।
বোধহয় আমরা জানি যে জগন্নাথ দেবকে উৎসর্গ করা প্রসাদ দেবী বিমলাকে নিবেদন করলে তবেই সেই প্রসাদ মহাপ্রসাদরূপে গণ্য হয়। বিমলা উড্ডীয়ান তন্ত্রের মূলা দেবী। শ্রীমন্দিরের নৈঋত অর্থাৎ দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে যে কুন্ড (রোহিনী কুন্ড )আছে সেই রোহিণীকুণ্ডের পাশে বিমলা দেবীর মন্দির। এই মন্দিরটির গর্ভগৃহটি রেখদেউল শৈলীর। এখানে গর্ভগৃহ, জগমোহন, নাটমন্দির ও ভোগমণ্ডপ অর্থাৎ এই চারটি অঙ্গযুক্ত সম্পূর্ণ মন্দির।
এখানে দেবীর মূর্তি কালোপাথরে খোদাই করা। দেবীর সর্বাঙ্গ ততোটা সুস্পষ্ট না হলেও বোঝা যায় দেবীর মূর্তি। দেবী দুই পায়ে সমান ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন প্রস্ফুটিত পদ্মের উপর। দেবী চতুর্ভুজা, নিচের ডান হাতে অক্ষমালা, উপরের দুহাতে দুটি মনুষ্যাকৃতি সর্পপাশ, নিচের বাম হাতে সুধাপূর্ণ কলস। কিন্তু ধ্যানমন্ত্রে আমরা পাই দেবী শ্বেতবর্ণ, ত্রিনেত্রা, মাথায় মণি শোভিত মুকুট। বিমলা দেবী হলেন আদি পরাশক্তির অন্যতম স্বরূপ এবং দেবীর দুপাশে দুই সহচরী, কালী এবং মহামায়া।
★★উৎসব বিগ্রহ বা "চলন্তি প্রতিমা"==>
এই "উৎসব বিগ্রহ" বা "চলন্তি প্রতিমা"
অর্থাৎ বৃহৎ প্রধান দেব দেবীর মূর্তির কিছু ছোট প্রতিমূর্তি। এই বিগ্রহগুলি মূল মূর্তির তুলনায় অনেক ছোট হওয়ায় সহজেই একস্থান থেকে অন্যত্র সহজে বহন করে নিয়ে যাওয়া যায়। তাই ওড়িয়া ভাষায় এই ধরনের বিগ্রহগুলিকে 'চলন্তি প্রতিমা' বলা হয়। এই উৎসব বিগ্রহগুলিই মূল দেবতার প্রতিনিধিরূপে বিভিন্ন উৎসবে যোগ দিয়ে পূজাভাগ গ্রহণ করেন।
★বিমলা দেবীর উৎসব বিগ্রহ===>
একটি সুন্দর রৌপ্য নির্মিত চতুর্ভুজা, সিংহবাহনা দুর্গাপ্রতিমা বিমলা দেবীর উৎসব বিগ্রহরূপে পূজিত হন। দেবীর ডানদিকের উপরের হাতে চক্র ও বামদিকের হাতে শঙ্খ। অপর দুই হাতে তিনি শূল দিয়ে মহিষাসুরকে বধ করছেন। ইনি আবার ★জয়দুর্গা নামে পূজিতা। শূল দিয়ে মহিষাসুরকে মর্দনরত ভঙ্গিমায় অবস্থানের জন্য এঁকে স্থানীয়ভাবে ★শূলিনীদুর্গাও বলা হয়। বিমলা দেবীর এই উৎসব বিগ্রহই হলেন★ 'দুর্গামাধব'।
"দুর্গামাধব"=দুর্গা + মাধব।
শ্রীমন্দিরের আরাধ্য দেবতা জগন্নাথের উৎসব বিগ্রহ অনেকগুলির মধ্যে যেমনি আছেন★ মদনমোহন, ★দোলগোবিন্দ, ★নারায়ণ ইত্যাদি ধাতুময় বিগ্রহ। তেমনই আছেন★ মাধব, যিনি জগন্নাথের একটি ক্ষুদ্রায়তন প্রতিমা। আয়তনে ছোট হওয়ার কারণে এঁকে★ কুষ্ঠি জগন্নাথ বা
★ বাল পুরুষোত্তম নামেও ডাকা হয়। কিন্তু এই "মাধব" তাঁদের সকলের থেকে আলাদা ইনি স্বয়ং জগন্নাথের 'চলন্তি প্রতিমা'।
★★রত্নবেদি===>
পুরীর মন্দিরের রত্নবেদি হলো একটি পবিত্র মঞ্চ যেখানে ভগবান জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার দেববিগ্রহ রাখা থাকে। এই মঞ্চটি ঐশ্বরিক অলঙ্কারে সজ্জিত এবং এর সঙ্গে অন্যান্য অনেক দেবদেবীদেরও স্থান রয়েছে। এই রত্নবেদি মন্দিরের একটি পবিত্র অংশ, যা দেবদেবীর বিগ্রহ স্থাপন এবং পূজার জন্য ব্যবহৃত হয়। রত্নবেদিতে দারুব্রহ্মের মোট পাঁচটি বিগ্রহ থাকে-●বলরাম, ●সুভদ্রা, ●জগন্নাথ, ●সুদর্শন এবং ●মাধব। মাধব থাকেন সুদর্শনের পিছনে, তাই সাধারণ ভাবে জগমোহন থেকে মাধবকে দেখতে পাওয়া যায় না। নবকলেবরের সময় জগন্নাথাদি বিগ্রহের সঙ্গেই মাধবেরও নবকলেবর হয়। আষাঢ় মাসের রথযাত্রায় জগন্নাথ-বলরামের সঙ্গে উৎসব বিগ্রহগুলি থাকলেও মাধব রথে থাকেন না। ★শ্রীদেবী ও ভূদেবীর সঙ্গে তাঁকে নাটমন্দিরে রেখে পূজাপাঠ করা হয়। এর কারণ হিসেবে জানা যায়, জগন্নাথের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে খ্যাত পৌরাণিক রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন জগন্নাথের কাছে প্রার্থনা করলে জগন্নাথ ইন্দ্রদ্যুম্নকে বলেছিলেন, তিনি কখনও এই মন্দির ছেড়ে যাবেন না। তাই রথযাত্রা থেকে পুনর্যাত্রা পর্যন্ত উৎসবের দিনগুলিতে জগন্নাথ গুণ্ডিচা মন্দিরে অবস্থান করার সময় মাধবই জগন্নাথের প্রতিনিধি হয়ে এই শ্রীমন্দিরে বিরাজ করেন। শ্রী জগন্নাথ দেব এবং দেবী বিমলা অর্থাৎ এই ভৈরব এবং ভৈরবীর বাহ্য সম্মিলনের সময় হল শারদীয়া মহাপূজা। আগেই উল্লেখ করেছি যে শ্রীক্ষেত্রের বিমলা দেবীর মন্দিরে আশ্বিন শুক্লা সপ্তমীথেকেই মহাপূজা শুরু হয়ে যায়, যাকে স্থানীয় ভাবে ★ "ষোলোপূজা"বলা হয়। এখানে দুর্গাপূজতে প্রতিদিন চণ্ডীপাঠ, দুর্গানাম জপ ইত্যাদি নানান অনুষ্ঠান হয়। "মন্দিরের নাটমন্দিরে দেবীর ★চুয়াল্লিশটি রূপের মূর্তি বিদ্যমান, প্রত্যেক মূর্তির আলাদাভাবে পূজা হয়।
★দুর্গা-মাধব পূজা:-----,
পুরীর শ্রী জগন্নাথ মন্দিরে দুর্গাপূজা বিশ্বাস করা হয় শক্তির অবতার দেবী সুভদ্রার আদেশে মন্দিরে দুর্গা-মাধব পূজা হয়। দেবী সুভদ্রার একাক্ষর মন্ত্র দিয়ে পূজা করা হয়।
★"রুদ্ধ" ক্রিয়া::=====>
পূজার রীতি অনুসারে প্রার্থনা করে জগন্নাথের আজ্ঞামালা বামদিকে থাকা মাধবকে দেওয়া হয়। আবার মাধবের সঙ্গে দুর্গার পূজা করার জন্য সুভদ্রার আজ্ঞামালা জয়দুর্গাকে দেওয়া হয়।
এর পরে হয় জলাভিষেক দেবী জয়দুর্গার সহস্র কুম্ভাভিষেকের কার্যক্রম শুরু হয়। তারপর নির্দিষ্ট দারুনির্মিত ভদ্রাসনে দুর্গা ও মাধবকে একত্রে বসিয়ে পটডোর দিয়ে বাঁধা হয়, একে★ "রুদ্ধ" ক্রিয়া বলে। এই অবস্থাতেই দুর্গামাধব শারদীয়া মহাপুজার দিনগুলি একত্রে অবস্থান করেন।
★★প্রার্থনা:===>
ওড়িশায়, বিমলা হলেন পরাশক্তি এবং পুরোশ্বরী, এই বিশ্বজগতের সমগ্র সৃষ্টির ভিত্তি ও মূল কারণ।
"হে!! দেবী, তোমার ভৈরব, মাধবের সাথে আমরা তোমার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করছি। দয়া করে আমাদের সকলকে আশীর্বাদ করুন।"
★বিমলাপরষ==> দেবীকে সন্তুষ্ট করার জন্য বিমলার খাবার পরিবেশন করা হয়। দুর্গাপূজার সময় সপ্তমী, অষ্টমী এবং নবমীতে, দেবীকে নিরামিষ সাত্ত্বিক খাদ্য উৎসর্গের পরিবর্তে আমিষ খাদ্য উৎসর্গের প্রচলন করা হয়।
মার্কণ্ড্য সরোবর থেকে মাছ আনা হয় এবং বিমলা মন্দিরের একপাশে একটি নির্দিষ্ট স্থানে, রীতি অনুসারে একটি অস্থায়ী রান্নাঘরে রান্না করা হয়। এই রান্না করা মাছের তরকারি তান্ত্রিক রীতি অনুসারে দেবী বিমলার উদ্দেশ্যে ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয়। দেবীকে উৎসর্গ করার জন্য একটি ছাগল আনা হয়। বিমলা মন্দিরের বাইরের প্রাঙ্গণে বকুল পিন্ডিতে বলিদান করা হয়। বিমলা মন্দিরে বলিদানের অনুষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট পূজার সময়, জগন্নাথের গর্ভগৃহের দরজা বন্ধ থাকে। রাতে শ্রী জগন্নাথকে ঘুম পাড়ানোর পর উৎসর্গ, রান্না এবং আমিষ খাবার উৎসর্গের এই সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়।এবং বিমলাপরসা বেছে বেছে বিতরণ করা হয়।
সূর্যোদয়ের আগে এই আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়, এবং সমস্ত প্রাঙ্গণ পরিষ্কার করা হয় যাতে শ্রী জগন্নাথের দরজা ত্রিমূর্তির নিয়মিত আচার -অনুষ্ঠানের জন্য খোলা যায়।
★শারদীয়া জগন্নাথ জয়দুর্গার গুণ্ডিচাযাত্রা===>
রীতি অনুসারে শুক্লা প্রতিপদ থেকে মহানবমী পর্যন্ত দিনগুলিতে দুর্গামাধব মন্দিরের বাইরে আসেন। তাঁদের যাত্রার জন্য একটি দারুনির্মিত চতুর্দোলা প্রস্তুত করা হয়। জগন্নাথের নন্দীঘোষ রথের মতোই এই রথের কাপড়ের রং হয় হলুদ এবং লাল। অর্থাৎ যেন নন্দীঘোষ রথেই ভৈরব জগন্নাথ তাঁর শক্তি ভৈরবী বিমলা বা দুর্গাকে নিয়ে বিহার করছেন। এর একটি লোকব্যাখ্যাও আছে। আষাঢ়ের রথের সময় মহালক্ষ্মী রথে স্থান পাননি। তিনি গুণ্ডিচা পর্যন্ত গিয়েও জগন্নাথের দর্শন না পেয়ে ফিরে এসেছিলেন। তাই মহালক্ষ্মীর অভিমান হয়েছিল। তাঁর অভিমান ভাঙাতেই জগন্নাথ এই শারদীয়া গুণ্ডিচাযাত্রার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এই রথযাত্রায় জগন্নাথ জয়দুর্গাকে সঙ্গে নিয়েছেন কারণ জয়দুর্গাই রূপভেদে মহালক্ষ্মী। এরপরে জগন্নাথের 'মধ্যাহ্নধূপ নীতি' বা মধ্যকালীন পূজা ও নির্দিষ্ট ক্রিয়া সমাপন হলে রথে করে দুর্গামাধবকে নিয়ে যাওয়া হয় নারায়ণী মন্দিরে। দুর্গামাধব বৎসরে এই একবারই আসেন এই নারায়ণী মন্দিরে। রথ থামতেই দুর্গামাধবের শ্রমভার লাঘব করার জন্য শ্রীমন্দিরের ব্রাহ্মণ কর্পূর মিশ্রিত পাদ্যজল অর্পণ করেন। তারপর নারায়ণী মন্দিরে দুর্গামাধবকে স্থাপন করা হয় ও মালপোয়া,গজা ইত্যাদি শুকনো ভোগ নিবেদন করা হয়। পূজার্চনা সমাপন হলে দুর্গামাধবকে নারায়ণী মন্দির থেকে পুনর্বার মন্দিরে প্রত্যাবর্তন করানো হয়। এবারে আর চতুর্দোলা নয়, দুর্গামাধব আসেন সুসজ্জিত বৃহৎ পালকিতে।
একইভাবে দুর্গামাধবের এই গুণ্ডিচাযাত্রা চলতে থাকে মহানবমী পর্যন্ত।
★জগন্নাথবল্লভ মঠ::====>
জগন্নাথ বল্লভ মঠ হলো পুরীর একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান, এটি জগন্নাথ দেবের বিশেষ পছন্দের "প্রমোদ উদ্যান" যেখানে শ্রী মন্দিরের জন্য ফুল ও ফল চাষ করা হতো এবং এটি বর্তমানে নরেন্দ্র সরোবরের দক্ষিণ তীরে অবস্থিত।
এই মঠটি "নবকলবর" অনুষ্ঠানের সাথেও
ওতপ্রোত ভাবে জড়িত এবং এখানে জগন্নাথের উৎসব মূর্তি আনা হয়। দুর্গাপূজার দশমীতে মদনমোহন, দোলগোবিন্দ সহ অপরাপর উৎসব বিগ্রহের সঙ্গে দশেরার উৎসবে যোগ দিতে দুর্গামাধবও আসেন জগন্নাথবল্লভ মঠে। সেখান থেকে ফিরে নির্দিষ্ট বিধিবৎ ক্রিয়া শেষ হলে দুর্গা এবং মাধবকে পৃথক করা হয়। দুর্গা সারা বছরের জন্য চলে যান বিমলার মন্দিরে, মাধবের পুনরায় স্থান হয় বড়দেউলের রত্নবেদিতে। এভাবেই শেষ হয় দুর্গামাধবের ষোড়শদিনের শারদীয়া গুন্ডিচা যাত্রা। এভাবেই শ্রীমন্দিরে মাত্র ষোলোদিনের জন্য দুর্গামাধবের একত্র উপাসনা হয়। তাঁদের একত্র বিহারের জন্য।
★ওড়িশায় দুর্গামাধবের পৃথক মন্দির আছে।অনেকের গৃহমন্দিরের প্রধান দেবতারূপেও দুর্গামাধব উপাসিত। পটচিত্র হিসেবেও দুর্গামাধবের পট ওড়িশাবাসীর কাছে খুবই জনপ্রিয়।
<----আদ্যনাথ রায় চৌধুরী---->
====================
No comments:
Post a Comment